আমার ভাই,
মৃত্যু একটি অনিবার্য বিষয়।প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।মৃত্যু এমন একটা বিষয় যেটিকে সকলেই বিশ্বাস করে।প্রতিটি ধর্মের মানুষ বিশ্বাস করে।এমনকি নাস্তিক যারা কোন ধর্ম মানে না,তারাও মৃত্যুকে বিশ্বাস করে।
দুনিয়াতে যে এসেছে তাকে অবশ্যই মরতে হবে।যখন কিয়ামত কায়েম হবে আল্লাহ সবাইকে মউত দিবেন।সকল ফেরেশতা মারা যাবে।সকল জিন মারা যাবে।সকল মানুষ মারা যাবে।সকল মাখলুক মারা যাবে।আল্লাহ ছাড়া কোন কিছুই জীবীত থাকবে না।একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই জীবীত থাকবেন।আল্লাহ হলেন চিরঞ্জীব।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ
প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।
وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُوْرَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۖ
"আর তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।"(সূরা আলে ইমরান-১৮৫)
আমার ভাই,এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন,প্রত্যককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতেই হবে।আর মৃত্যুর পর আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের কর্মের পরিপূর্ণ প্রতিদান দেবেন।যে ভাল কাজ করবে তাকে পুরস্কৃত করবেন।আর যে গুনাহের মধ্যে জীবন কাটাবে তাঁকে শাস্তি দেবেন।
আমার ভাই,দুনিয়াতে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করবেন।কখনো বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করবেন।কখনো সুখ দিয়ে পরীক্ষা করবেন।কখনো সুস্থতা দিয়ে পরীক্ষা করবেন।কখনো অসুস্থতা দিয়ে পরীক্ষা করবেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ
"প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে
وَنَبْلُوْكُمْ بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً ۖ
আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করবো।
وَإِلَيْنَا تُرْجَعُوْنَ
আর আমার দিকেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে।"(সূরা আমবিয়া ৩৫ নং আয়াত)
আমার ভাই,জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।যার যে সময়ে মৃত্যু নির্ধারিত তাকে সে সময়ই মৃত্যুবরণ করতে হবে।এক মহূর্তের জন্যও কাউকে অবকাশ দেয়া হবে না।আবার এক মুহূর্তের জন্যও কারো মৃত্যু আগে হবে না।যার যে সময়ে মৃত্যু নির্ধারিত রয়েছে তাকে সে সময়ই মৃত্যু বরণ করতে হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ ۖ
"প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি সময় রয়েছে।
فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ
যখন তাদের সময় এসে যাবে
لَا يَسْتَأْخِرُوْنَ سَاعَةً ۖ وَّلَا يَسْتَقْدِمُوْنَ
তারা এক মুহূর্তও পিছনে যেতে পারবে না এবং সামনেও অগ্রসর পারবে না।"(সূরা আ’রাফ ৩৪ এবং সূরা ইউনুস ৪৯ নং আয়াত)
আমার ভাই,কেউ যদি মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্য আসমানে চলে যায়,সমুদ্রের গভীর তলদেশে চলে যায়,মজবুত প্রাসাদ বানায় সে কখনোই মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না।যেখানেই সে যাক না কেন, মৃত্যু তাকে পাকড়াও করবেই।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
أَيْنَمَا تَكُوْنُوْا يُدْرِكْكُّمُ الْمَوْتُ
তোমরা যেখানেই থাকো,মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই
وَلَوْ كُنْتُمْ فِيْ بُرُوْجٍ مُّشَيَّدَةٍ ۗ
"যদিও তোমরা সুদৃঢ় দূর্গে অবস্থান করো না কেনো(সূরা নিসা ৭৮ নং আয়াত)
আমার ভাই,আমরা যেখানেই থাকি,মৃত্যু এসে আমাদেরকে ধরবেই।তো মৃত্যু সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যই বা কি?কেনই বা মৃত্যুকে সৃষ্টি করা হলো?কেনই বা জীবন দেয়া হলো?এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
الَّذِيْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ
তিনিই সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন
لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ
“তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে তোমাদের মধ্যে আমলে কে উত্তম।”(সূরা মুলক-২)
এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা জানিয়ে দিয়েছেন যে মৃত্যুকে বানানোর উদ্দেশ্যই হলো বান্দাকে পরীক্ষা করা।বান্দা দুনিয়াতে ভাল কাজ করে না মন্দ কাজ করে এটা আল্লাহ দেখবেন।কার আমল কত সুন্দর।কার ইবাদত কত সুন্দর।কে কত বেশি আল্লাহর ইবাদত করে,আল্লাহর আনুগত্য করে আল্লাহ তা দেখবেন।যারা দুনিয়াতে আল্লাহ তা’আলার দাসত্ব করবে,আল্লাহ তা'আলার হুকুম মত চলবে,ভাল কাজ করবে তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা জান্নাত দান করবেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
أَمَّا الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوْا الصَّالِحَاتِ
অতঃপর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে
فَلَهُمْ جَنَّاتُ الْمَأْوَىٰ
তাদের জন্য রয়েছে বসবাসের উদ্যান
نُزُلًا بِمَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ
তাদের কৃতকর্মের মেহমানদারী স্বরূপ । (সূরা আস সাজদা ১৯ নং আয়াত)
পক্ষান্তরে যারা মন্দ কাজ করে,আল্লাহ তা’আলার নাফরমানি করে,নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তাদের জন্য মৃত্যুর পর রয়েছে কঠিন শাস্তি।তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَأَمَّا الَّذِيْنَ فَسَقُوْا
আর যারা অবাধ্যতা করেছে
فَمَأْوَاهُمُ النَّارُ ۖ
তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম।
كُلَّمَا أَرَادُوْا أَن يَخْرُجُوْا مِنْهَا
যখনই তারা তা থেকে বের হতে চাইবে
أُعِيْدُوْا فِيْهَا
তাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে দেয়া হবে।
وَقِيْلَ لَهُمْ
আর তাদেরকে বলা হবে
ذُوْقُوْا عَذَابَ النَّارِ الَّذِيْ كُنْتُمْ بِهٖ تُكَذِّبُوْنَ
তোমরা জাহান্নামের শাস্তি স্বাদ আস্বাদন করো যাকে তোমরা অস্বীকার করতে ।(সূরা আস সাজদা ২০ নং আয়াত)
আমার ভাই,আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার বড় দুটি কারণ হলো সম্পদের লোভ এবং দীর্ঘ জীবনের আাশা করা। সম্পদের লোভ থাকার কারণে আমরা অল্পতে তুষ্ট হতে পারি না।আমাদের মধ্যে এই অবস্থা কাজ করে যে এতটুকু সম্পদে হচ্ছে না।আরো চাই,আরো চাই।ফলে সম্পদ কামাই করতে গিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে যায় যে মৃত্যুর কথা আর স্মরণে থাকে না।সম্পদ পেলেই হলো। কোন পথে এলো? হালাল পথে না হারাম পথে তা যাচাই করারও সময় পাইনা।শুধু দরকার সম্পদ আর সম্পদ।
আমার ভাই,আবার আমাদের অবস্থা এমন হয়ে গেছে যে আমরা কেউ মরতে চাই না।আমরা প্রত্যেকেই দীর্ঘ জীবনের আশা করি।এ কারণে বিরাট বিরাট প্লান করি।বিরাট বিরাট কাজে হাত দেই।যে কাজ গুলো আমার ১৪ পীড়িও শেষ করতে পারবে না।তারপরও করি কারণ দীর্ঘ জীবনের স্বপ্ন দেখি।এই সম্পদের লোভ আর দুনিয়াতে দীর্ঘ জীবন বাঁচার স্বপ্ন দেখার কারণে আমরা আখিরাতকে ভুলে যায়।
আমার ভাই,শুধু যুবকই নয়,যারা বুড়ো হয়ে গেছে,বার্ধক্যে পৌঁছে গেছে,তাদেরও সম্পদের লোভ কমে না।তারাও দীর্ঘ জীবন বাঁচার স্বপ্ন দেখে।
তিরমিযীর এক হাদীসে এসেছে,হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
يَهْرَمُ ابْنُ آدَمَ
আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যায়
وَيَشِبُّ مِنْهُ اثْنَتَانِ
অথচ তার দুটো জিনিস যুবকই থেকে যায়
اَلْحِرْصُ عَلَى الْعُمُرِ
বেঁচে থাকার লোভ
وَالْحِرْصُ عَلَى الْمَالِ
সম্পদের প্রতি লোভ(তিরমিযী-২৩৩২-সহীহ-তিরমিযী-কম্পিউটার-ইসলামিয়া কুতুবখানা)
আমার ভাই,দুনিয়ায় বেঁচে থাকার আসক্তি এবং সম্পদের মোহ কমানোর জন্য আমাদেরকে বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করতে হবে।মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করলে দুনিয়ায় বেঁচে থাকার চাহিদা কমে যাবে,সম্পদের মোহ কমতে থাকবে।আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেয়া সহজ হবে।আমল করা সহজ হবে।প্রতিদিন মৃত্যুকে স্মরণ করি।নিজেকে বোঝাই আর কটা দিন এই দুনিয়াতে থাকবো।তারপর অনন্তকালের জন্য পরকালে পাড়ি জমাবো।এভাবে যদি চলতে পারি আমার জীবন পাল্টে যাবে।জীবনের সময়গুলো আল্লাহর ইবাদতে কাটানো সহজ হবে।
তিরমিযীর এক হাদীসে এসেছে,হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَكْثِرُوْا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِيْ اَلْمَوْتَ°
তোমরা স্বাদ বিনষ্টকারী (অর্থাৎ মৃত্যুকে) বেশি বেশি স্মরণ করো।(তিরমিযী-২৩০০-হাসান-কম্পিউটার নুসখা-ইসলামিয়া কুতুবখানা)
আমার ভাই,মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করলে দুনিয়ার প্রতি মহব্বত কমে যাবে।আল্লাহর সঙ্গে মহব্বতের সম্পর্ক গড়ে উঠবে।কারণ মৃত্যুকে স্মরণ করলে আমার মধ্যে এই চিন্তা কাজ করবে যে আমাকে এই দুনিয়া ছাড়তে হবে।বাড়ি-ঘর ছাড়তে হবে।স্ত্রী-সন্তান ছাড়তে হবে।জমি-জমা,বাগান-ভিটা ছাড়তে হবে।টাকা-পয়সা ছাড়তে হবে।সবকিছু ছেড়ে অন্ধকার কবরে থাকতে হবে।তখন আমার মধ্যে পরকালের জন্য আমল করার আগ্রহ পয়দা হবে।এই জন্যই নবীজী মউতকে বেশি বেশি স্মরণ করতে বলেছেন।
আমার ভাই,আমরা সম্পদের হিসাব করি।টাকা পয়সার হিসাব করি।মাসে কত আয় করি, কত ব্যয় করি এগুলোর হিসাব করি।কিন্তু হিসাব নেই না আমলের।আমার সারাদিন চলে গেল কিন্তু আমি কি পরিমাণ আমল করলাম,কতটুকু গুনাহ হয়ে গেল তার হিসাব নেই না।ফলে আমাদের দিনগুলো গাফলতের মধ্যে কেটে যাচ্ছে আর এভাবেই আমি মৃত্যুর কাছাকাছি হচ্ছি।তাই আমাদের উচিত নিজের আমলের হিসাব নিতে থাকা।প্রতিদিন আমি কি আমল করলাম তার হিসাব নেয়া।আজকে যা কম হলো আগামীকাল যেন বেশি হয়,আগামীকালের দিনটা যেন গুনাহমুক্ত হয়, ইবাদত বন্দেগীতে কাটে তার চেষ্টা করা।
আমার ভাই,আমাদেরকে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবার পর আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।এই জীবনের হিসাব দিতে হবে।তো আমি যদি দুনিয়াতে থাকতেই নিজের আমলের হিসাব নিতে থাকি পরকালে আমার হিসাব দেওয়া সহজ হবে।আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে যথাযথভাবে মৃত্যুর প্রস্তুতি নেয়ার তাওফিক দান করুন।পরকালে যেসব আমল কাজে আসবে সেগুলো করার তাওফিক দান করুন।আমীন।
