তাবলীগের বয়ান---৫ - iAlo24.Blogspot.Com

রবিবার, অক্টোবর ০৬, ২০২৪

তাবলীগের বয়ান---৫

 


বিপদাপদে সবর করা


আমার ভাই,আল্লাহ তা’আলা হায়াত-মউত সৃষ্টি করেছেন আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। আর এ পরীক্ষা চলতে থাকবে মৃত্যু পর্যন্ত।আমরা মুখে স্বীকার করেছি আল্লাহ তা’আলা এক।তিনিই একমাত্র মা’বুদ।তিনি ছাড়া কোন মা’বুদ নাই।আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবো।তাঁরই হুকুম মেনে চলবো।
তো আমরা আমাদের কথায় সত্যবাদী কিনা তা তিনি পরীক্ষা করে দেখবেন।কে প্রকৃত ইমানদার আর কে মুনাফিক তা যাচাই করবেন।এজন্য একজন ইমানদার ব্যক্তির উপর মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন ধরণের বিপদ-আপদ আসতে থাকবে।আল্লাহ তা’আলা বলেন,
أَحَسِبَ النَّاسُ
মানুষ কি মনে করে যে,
أَنْ يُّتْرَكُوْا أَنْ يَقُوْلُوْا آمَنَّا
তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এ কথা বলেই যে আমরা ইমান এনেছি
وَهُمْ لَا يُفْتَنُوْنَ
এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না।(সূরা আনকাবুত-২)
আমার ভাই,ইমান আনার পর থেকেই আমাদের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।আল্লাহ তা’আলা মাঝে মাঝেই বালা মুসীবত দিয়ে আমাদেরকে পরীক্ষা করবেন।আর পরীক্ষা শুধু আমাদেরকেই করা হবে না বরং আমাদের পূর্ববর্তীদের করা হয়েছিলো।আমাদের পূর্বে যত উম্মত গত হয়েছে তাদের প্রত্যেককেই পরীক্ষা করা হয়েছিলো।আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ ۖ
আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছি
فَلَيَعْلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِيْنَ صَدَقُوْا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِيْنَ
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই জেনে নেবেন সত্যবাদীদেরকে এবং জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে।(সূরা আনকাবুত-৩)
আমার ভাই,একজন মানুষকে পরীক্ষা করা হয় তার ইমান অনুপাতে।যার ইমান যেমন হবে তার পরীক্ষাও তেমন হবে।যার ইমান  যত বেশি মযবুত হবে তার পরীক্ষাও তত কঠিন হবে।
তিরমিযীর এক হাদীসে এসেছে,হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাঃ নবীজীকে বললেন,হে আল্লাহর রাসূল!
أَيُّ النَّاسِ أَشَدُّ بَلَاءً ؟
কোন মানুষের বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়?
নবীজী বললেন,
اَلْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الأَمْثَلُ فَالْأَمْثَلُ
নবীগণের পরীক্ষা সবচেয়ে বেশি কঠিন হয় এরপর যারা নেককার তাদের,অতঃপর যারা নেককার তাদের।
فَيُبْتَلَى الرَّجُلُ عَلٰى حَسَبِ دِينِهٖ
মানুষকে পরীক্ষা করা হয় তার দীন অনুপাতে।
فَإِنْ كَانَ دِيْنُهُ صُلْبًا اِشْتَدَّ بَلَاؤُهُ
যদি তার দীন মযবুত হয়,তার পরীক্ষাও কঠিন হয়।
وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهٖ رِقَّةٌ
আর কেউ যদি তার দীনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়
اُبْتُلِيَ عَلٰى حَسَبِ دِينِهٖ
তাকে পরীক্ষা করা হয় তার দীন অনুপাতে
فَمَا يَبْرَحُ البَلَاءُ بِالعَبْدِ
বান্দার উপর বিপদাপদ লেগেই থাকে।
حَتّٰى يَتْرُكَهُ يَمْشِيْ عَلَى الأَرْضِ مَا عَلَيْهِ خَطِيْئَةٌ
এমনকি তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে যমীনের উপর চলাফেরা করে অথচ তার কোন গুনাহই থাকে না।(তিরমিযী-২৩৯২-সহীহ-কম্পিউটার নুসখা-ইসলামিয়া কুতুবখানা)
আমার ভাই,বিপদাপদ আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে একটি নে’আমত।এর দ্বারা বান্দার গোনাহ মাফ করা হয় এবং জান্নাতে মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
কখনো অভাবের দ্বারা পরীক্ষা করা হয়,কখনো ক্ষুধা ও ভয় দ্বারা,কখনো প্রাণের উপর ক্ষতি হওয়ার দ্বারা,কখনো ধন-সম্পদের ক্ষতি দ্বারা।বান্দাকে নানাভাবে পরীক্ষা করা হয়।আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِيْنَ
অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো কিছুটা ভয়,ক্ষুধা এবং জান,মাল,ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে।ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দান করুন।(সূরা বাকারা ১৫৫ নং আয়াত)
আমার ভাই,বান্দার জীবনে বিপদাপদ আসবে।বিপদ এলে ধৈর্য ধারণ করবো আর বলবো,
إِنَّا لِلّٰهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য,আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাবো।
আমার ভাই,বিপদাপদে সবর করার ফযীলত বিরাট বড়।সবরের বিনিময়ে মিলবে জান্নাত।মিলবে শান্তি।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
أُولٰئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوْا
তাদেরকে তাদের সবরের বিনিময়ে জান্নাতে ঘর দেওয়া হবে,
وَيُلَقَّوْنَ فِيْهَا تَحِيَّةً وَّسَلَامًا
এবং তাদেরকে সেখানে অভ্যর্থনা জানানো হবে দু’আ ও সালাম সহকারে।(সূরা  ফুরকান ৭৫ নং আয়াত)
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَالَّذِيْنَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ
এবং যারা স্বীয় পালনকর্তার সন্তুষ্টির জন্যে সবর করে,
وَأَقَامُوْا الصَّلَاةَ
এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে
وَأَنْفَقُوْا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَّعَلَانِيَةً
আর আমি তাদেরকে যা দিয়েছি,তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে
وَيَدْرَءُوْنَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ
এবং যারা মন্দের বিপরীতে ভাল করে,
أُولٰئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ
তাদের জন্যে রয়েছে পরকালের গৃহ।"
(সূরা-রা'দ-২২)
جَنَّاتُ عَدْنٍ يَّدْخُلُوْنَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ ۖ
তা হচ্ছে বসবাসের বাগান। তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের সৎকর্মশীল বাপ-দাদা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানেরা।
وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُوْنَ عَلَيْهِمْ مِّنْ كُلِّ بَابٍ
এবং ফেরেশতারা তাদের কাছে আসবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে।(সূরা রা'দ-২৩)
سَلَامٌ عَلَيْكُم بِمَا صَبَرْتُمْ ۚ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ
"বলবেঃ তোমাদের সবরের কারণে তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আর তোমাদের এ পরিণাম-গৃহ কতই না চমৎকার।(সূরা রা'দ-২৪)
আমার ভাই,সবরের বিনিময়টা এতোটা বিশাল যে সবরকারীদেরকে সীমাহীন প্রতিদান দেওয়া হবে।তাদের প্রতিদান হবে সবচেয়ে বেশি।আল্লাহ তা’আলা বলেন,
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُوْنَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
"নিশ্চয় সবরকারীদেরকে বেহিসাব পুরস্কার দেওয়া হবে।(সূর যুমার ১০ নং আয়াত)
আমার ভাই,বিপদাপদে আমরা অস্থির হবো না।যে কোন বিপদ আসুক তা হাসি মুখে মেনে নিবো।বিপদাপদ আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে আসে।তা হঠানোর ক্ষমতা কারো নেই।বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহ তা’আলার কাছে নামায পড়ে দু’আ করবো।আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবো।তিনি ছাড়া বিপদ থেকে মুক্তি দাতা কেউ নেই।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا اسْتَعِيْنُوْا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ
হে ইমানদারগণ,তোমরা সবর এবং নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও।
إِنَّ اللّٰهَ مَعَ الصَّابِرِيْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন।(সূরা বাকারা ১৫৩ নং আয়াত)
আমার ভাই,যে কোন বিপদ হোক,অসুস্থতা হোক আর অভাব হোক, কেউ মারা যাক বা যত বড় ক্ষতিই হোক না কেন আমরা সবর করবো।হা-হুতাশ করে অস্থির হবো না।ভেঙ্গে পড়বো না।বরং নামায পড়ে আল্লাহর কাছে দু’আ করবো।আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবো।আমাদের প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনেও অনেক বিপদ এসেছিলো।
যখন তিনি মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন মক্কার লোকেরা তাঁর বিরোধিতা শুরু করলো।তাঁকে নানা ভাবে কষ্ট দিতে লাগলো।এমনকি হত্যা করার যড়যন্ত্র শুরু করলো।ফলে নবীজী নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে মক্কা থেকে মদীনায় এলেন।মদীনায় এসেও তিনি শান্তিতে থাকতে পারলেন না।একের পর এক যু্দ্ধ লেগেই থাকলো।উহুদের ময়দানে দাঁত মোবারক শহীদ করলেন।মেবারক মাথা থেকে রক্ত ঝরলো।খন্দকের যুদ্ধে ক্ষুধার কারণে পেটে পাথর বাঁধলেন।মাসের পর মাস তার পরিবারে আগুন জ্বলেনি।খেজুর ও পানি খেয়ে কাটিয়েছেন।তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর তিন ছেলে ও তিন মেয়ে মারা গিয়েছিলো।নবীজী ছিলেন সবচেয়ে বেশি আল্লাহর প্রিয়পাত্র।এজন্য তাঁর পরীক্ষাও হয়েছিলো সবচেয়ে বেশি কঠিন।তাঁরপর সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন আল্লাহর প্রিয়পাত্র।এজন্য সাহাবায়ে কেরামকেও কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিলো।
আমার ভাই,এজন্য বিপদ আপদ অসুখ-বিসুখ হলে সবর করবো।আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবো।নিজের গোনাহের জন্য মাফ চাইবো।আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে বিপদাপদে সবর করার তাওফিক দান করুন।আমীন।

Pages