দুনিয়ার বাস্তবতা
আমার ভাই,আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে পৃথিবী নামক এই গ্রহে সৃষ্টি করে পাঠিয়েছেন।আমাদের মাথার উপরে আছে সাত আসমান।সাত আসমানের উপরে আছে জান্নাত।আল্লাহ তা’আলা আমাদের আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং আদি মাতা হযরত হাওয়া আলাইহাস সালামকে সৃষ্টি করে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছিলেন।তারপর জান্নাত থেকে এই দুনিয়া নামক গ্রহে প্রেরণ করেন।আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষা করা।আমরা কে কে দুনিয়াতে আল্লাহর ইবাদত করছি আর কে কে আল্লাহর ইবাদত করছি না তা আল্লাহ তা’আলা দেখতে চান।যারা এই দুনিয়াতে আল্লাহর হুকুম মেনে চলবে মৃত্যুর পর পুনরায় আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে জান্নাত দেবেন।আর যারা আল্লাহর হুকুম মেনে চলবে না আল্লাহ তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জাহান্নামের শাস্তি।
আমার ভাই,এই দুনিয়াতে আমরা অল্প কিছু দিন অবস্থান করবো।তারপর এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবো।দুনিয়ার নিয়মও এটাই যে দুনিয়াতে কেউ চিরস্থায়ী থাকতে পারবে না আবার দুনিয়াও কাউকে এখানে রাখবে না।সবাইকে এই দুনিয়া ছাড়তে হবে।দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে মানুষ যেন পরকালকে ভুলে না যায় এজন্য দুনিয়া সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সতর্ক করেছেন।দুনিয়ার হাকীকত এবং বাস্তবতা মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَمَا هٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَّلَعِبٌ ۚ
এই দুনিয়ার জীবন আনন্দ-ফুর্তি ও খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়।
وَإِنَّ الدَّارَ الْاٰخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ ۚ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ
আর আখিরাতের জীবনই হলো আসল জীবন।যদি তারা জানতো।(সূরা আনকাবুত ৬৪ নং আয়াত)
আমার ভাই,এই আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে দুনিয়ার জীবনটা আনন্দ-ফুর্তির জীবন।দুনিয়ার জীবনটা হলো খেল-তামশার জীবন।এই দুনিয়ার জীবনে না পরিপূর্ণ সুখ আছে,না পরিপূর্ণ আনন্দ আছে।দুনিয়াতে সুখ যেমন আছে, দুঃখও আছে।আনন্দ যেমন আছে,কষ্টও আছে।দুনিয়ার যৌবনও ক্ষণস্থায়ী।বেশিদিন যৌবন থাকে না।আবার দুনিয়াতে ইচ্ছা করলেই আমরা মনমত খেতে পারি না।অল্প খেলেই পেট ভরে যায়।বেশি খেলে বদহজম হয়।বিভিন্ন অসুখ হয়।দুনিয়াতে আছে বিপদ-আপদ,পেরেশানি।একটার পর একটা লেগেই থাকে।আবার দুনিয়ার সম্পদও সীমীত।
সারা জীবন মেহনত করেও আমরা এই এলাকার মালিক হতে পারবো না।প্রতিদিন গোশত,পোলাও কোর্মা আমাদের সবার পক্ষে খাওয়াও সম্ভব নয়।
পক্ষান্তরে আখিরাতের জীবনটাই হলো আসল জীবন।আখিরাতে আল্লাহ যাকে জান্নাত দেবেন তার সুখের শেষ নেই।জান্নাতে না আছে দুঃখ,না আছে কষ্ট,না আছে বিপদ-আপদ,না আছে পেরেশানি।জান্নাতের যৌবন চিরস্থায়ী।কখনো বার্ধক্য আসবে না।শরীরে ময়লা জমবে না।অসুখ-বিসুখ হবে না।জান্নাতে খাবারের কোন সীমা নেই। জান্নাতে কোন ব্যক্তি ইচ্ছে করলেই একটা গোটা গরুর গোশত খেয়ে ফেলতে পারবে।যদি আবার খেতে চায় তাহলে একটা ঢেকুর উঠলেই খাবার হজম হয়ে যাবে।আবার সে খেতে পারবে।যদি সারাদিন সে খেতে চায় সারাদিন খেতে পারবে।কখনো খাবার শেষ হবে না।সবার শেষে যে জান্নাতে যাবে আল্লাহ তা’আলা তাকে এই দুনিয়ার সমান দশ দুনিয়া জান্নাত দান করবেন।
আমার ভাই,এজন্য দুনিয়া সম্পর্কে আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে।আমরা যেন দুনিয়াতে এমন ভাবে লিপ্ত না হয়ে পড়ি যে আখিরাতে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলাম।দুনিয়ার কাজ-কর্ম করতে করতে আমি আখিরাতকে নষ্ট করে ফেললাম।দুনিয়া হলো ধোঁকা ও প্রতারণার ঘর।দুনিয়ার ধোঁকা খেয়ে যে বোকা হবে পরকালে সে ভয়াবহ ক্ষতির মধ্যে পড়বে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ
“দুনিয়ার জীবন ধোঁকার আসবাব ছাড়া কিছুই নয়।”(সূরা আলে ইমরান ১৮৫ নং আয়াত)
আমার ভাই,একজন মানুষ রাত-দিন পরিশ্রম করে অনেক টাকা কামাই করলো।টাকা কামাই করতে গিয়ে কোন হালাল হারামের বাছ বিছার করলো না।সুদ-ঘুষ খেয়ে অনেক সম্পদের মালিক হলো।সেই টাকা দিয়ে সে একটি জায়গা কিনলো।সেখানে সে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি নির্মাণ করলো।যেদিন নতুন বাড়িতে উঠবে তার আগের দিনই সে মারা গেলো।নতুন বাড়ি তার কপালে জুটলো না।চলে গেলো আসল বাড়িতে।
আমার ভাই এটাই হলো দুনিয়ার বাস্তবতা।তার না জুটলো দুনিয়ার সুখ,না জুটবে আখিরাতের সুখ।এই দুনিয়ার বাড়ি-ঘর,জমি-জমা,ধন-সম্পদ কোন কিছুই আমার নয়।কিছুদিনের জন্য এগুলো আমার মালিকানায় আছে।তারপর সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে।এজন্য যারা আল্লাহর হুকুম নষ্ট করে রাত-দিন দুনিয়ার পিছনে ছুটছে তারা পরকালে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমার ভাই,দুনিয়া করতে নিষেধ নাই।দুনিয়া নিয়েই তো আমাদের জীবন।দুনিয়াতে আমরা এসেছি আল্লাহর ইবাদত করার জন্য।তো এখানে থাকতে হলে বাড়ি প্রয়োজন।সম্পদ প্রয়োজন।বেঁচে থাকতে হলে খাবার-দাবারের প্রয়োজন।স্ত্রীর প্রয়োজন।কিন্তু এগুলোর পিছনে এমন ভাবে মত্ত না হওয়া যে আমার থেকে আল্লাহর হুকুম লংঘন হয়ে যায়।পক্ষান্তরে আমি যদি আল্লাহর হুকুম মত দুনিয়ার কাজ-কর্ম করি দুনিয়ার এসব কাজ-কর্ম সওয়াবে পরিণত হবে।
আমার ভাই,আল্লাহ তা’আলা ইমানদার ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন,
رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَّلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللهِ
তারা এমন লোক ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় যাদেরকে আল্লাহর যিকির থেকে বিরত রাখে না।”(সূরা নূর ৩৪ নং আয়াত)
আমার ভাই,একজন ইমানদার ব্যক্তি কখনো আল্লাহকে ভুলে না।সদা-সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করে।বাজারে গেলেও আল্লাহকে স্মরণ করে।ক্ষেত-খামারে গেলেও আল্লাহকে স্মরণ করে।কর্মক্ষেত্রে গেলেও আল্লাহকে স্মরণ করে।কেনা-বেচা করার সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে।বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে।বাড়িতে প্রবেশ করার সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে।খাওয়ার শুরুতেও আল্লাহকে স্মরণ করে।খাওয়ার শেষেও আল্লাহকে স্মরণ করে।ঘুমানোর সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে।ঘুম থেকে ওঠার সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে।সুখের সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে।দুঃখের সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করে।অর্থাৎ দুনিয়ার কোন কর্ম তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে না।
আমার ভাই,আমরা হলাম এই দুনিয়ার মুসাফির।কিছুদিনের জন্য এসেছি।সময় শেষ হলে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবো।কেউ যদি কোন কাজে ঢাকা সফর করে তো সেখানে সে বাড়ি-গাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখে না। আরাম-আয়েশে থাকার চিন্তাও করে না।বরং তার কাজ শেষ হতে যতটুকু সময় লাগে ততটুকুই সেখানে থাকে।কাজ শেষ হলে আবার বাসায় চলে আসে।আমরাও দুনিয়াতে এসেছি জান্নাত কামাই করার জন্য।আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য।বুদ্ধিমান তো সেই যে পরকালের আমল করতে থাকে আর নিজেকে দুনিয়ার মুসাফির ভাবে।দুনিয়ার আরাম-আয়েশের প্রতি তার তেমন খেয়াল থাকে না।
বুখারীর এক হাদীসে এসেছে,হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাঃ কে বলেন,
كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيْبٌ، أَوْ عَابِرُ سَبِيْلٍ
“দুনিয়াতে এমনভাবে থাক যেন তুমি প্রবাসী অথবা পথের পথিক।”(বুখারী-৬৪১৬)
আমার ভাই,নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুনিয়ার জীবন ছিল সাদাসিধা।তিনি সহজ সরল জীবন যাপন করতেন।দুনিয়ার ভোগ-বিলাসী জীবন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতেন।দুনিয়ার ব্যাপারে হা-হুতাশ করতেন না।ক্ষুধার কারণে পেটে পাথর বেঁধেছেন।জীবনে কখনো পেটপুরে দুবেলা খাননি।তাঁর ঘরে মাসের পর মাস আগুন জ্বলেনি।
পানি আর খেজুর খেয়েই কাটিয়ে দিতেন দীর্ঘ সময়।তিনিই হলেন বিশ্বনবী।আমাদের নবী।আর আমরা তাঁর উম্মত হয়েও দুনিয়ার জন্য আমাদের হা-হুতাশের শেষ নাই।শুধুই না পাওয়ার অভিযোগ।এই নাই,সেই নাই।কত রকম আমাদের অভিযোগ।
তিরমিযীর এক হাদীসে এসেছে,হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَا لِيْ وَلِلدُّنْيَا
দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক?
مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبٍ
দুনিয়াতে আমার অবস্থা হলো ঐ আরোহীর ন্যায়
اِسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ
যে কোন গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিলো,
ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا
অতঃপর সে বিশ্রাম করলো এবং সে স্থান ছেড়ে চলে গেলো।(তিরমিযী-২৩৬৯-সহীহ-কম্পিউটার ইসলামিয়া কুতুবখানা)
আমার ভাই,আমাদের নবীজী দুনিয়াতে একজন আরোহীর ন্যায় জীবন যাপন করতেন।আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর মধ্যে কাটাতেন।সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করতেন।আমাদেরকেও একজন আরোহীর ন্যায় জীবন যাপন করতে হবে।দুনিয়ার জন্য অধিক ছুটোছুটি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন।আমীন।
এরপর প্রথম বয়ানের শেষের লেখাগুলো বলে তাবলীগে বের হওয়ার তাশকিল করবো।
