আল্লাহর স্মরণ এবং নেক আমল দিয়ে
জীবন সাজানো
আমার ভাই,আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য।দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন পরীক্ষা করার জন্য।আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর আনুগত্য করা,তাঁর হুকুম মেনে চলা।আর এর উপরই মৃত্যুর পর আমাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে।যার ইবাদত ইখলাসের সাথে যত বেশি হবে,যার আমল যত সুন্দর হবে মৃত্যুর পর তার পুরস্কারও তত বড় হবে।তার মর্যাদাও তত বেশি হবে।
আমার ভাই,আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য,খাওয়া-দাওয়া, অর্থ-সম্পদ কামাই করার জন্য দুনিয়াতে পাঠাননি।আমাদেরকে পাঠিয়েছেন ইবাদত করার জন্য।কিন্তু আমাদের অবস্থা হলো এমন আমরা ইবাদত বাদ দিয়ে সবকিছুই করছি।আমাকে আল্লাহ তা’আলা বানালেন ইবাদতের জন্য আর আমি সেই ইবাদত বাদ দিয়ে এই দুনিয়ার পিছনে ছুটছি।এটা বোকামি ছাড়া কিছুই না।
দুনিয়া আমাদের জরুরত।দুনিয়াতে ইবাদত করতে হলে থাকা-খাওয়া প্রয়োজন।তাই এগুলো করতে হয়।কিন্তু আমাদের অবস্থা হলো আল্লাহর ইবাদত করা যা আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো তা বাদ দিয়ে শুধু দুনিয়াবী জরুরতের পিছনেই ছুটছি।না ভাই,আমাকে সচেতন হতে হবে।আমাকে সতর্ক হতে হবে।নিজেকে এই কথা বোঝাতে হবে যে আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য,আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا
হে ইমানদারগণ
اُذْكُرُوْا اللّٰهَ ذِكْرًا كَثِيْرًا
তোমরা বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করো
وَسَبِّحُوْهُ بُكْرَةً وَّأَصِيْلًا
এবং সকাল সন্ধ্যা তাঁরই তাসবীহ পাঠ করো।”
(সূরা আহযাব ৪১-৪২)
আমার ভাই,এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন বেশি বেশি যিকির করতে।বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যা তাসবীহ পাঠ করতে।এখন দেখার বিষয় আমি কতটুকু আল্লাহর যিকির করি। সারাদিন কতটুকু আল্লাহকে স্মরণ করি।যদি খুঁজে দেখি তাহলে এটাই দেখতে পাবো যে আমরা খুব কম সময়ই আল্লাহর যিকির করি।আর দুনিয়াবী কাজে সারাটা দিন কাটাই।চায়ের দোকানে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প গুজবে ব্যস্ত থাকি।বন্ধুদের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে পার করে দেই।খাওয়া-দাওয়ার ব্যস্ততায় কেটে যায় অনেক সময়।ঘুমের মধ্যে কেটে যায় অনেক সময়।আজ এই প্রযুক্তির যুগে ফেসবুক আর ইউটিউবে কাটিয়ে দেই লম্বা সময়।সবকিছুই করি কিন্তু আল্লাহর যিকিরের জন্য সময় বের করি না।সারাদিন কেটে যায় কুরআন তিলাওয়াতের সময় হয় না।সারাদিন চলে যায় কিছু ইলম শিখবো তারও সময় হয় না।আমি কত ব্যস্ত!
আমার ভাই,এই অনর্থক গল্পগুজব আর অনলাইনে সময় ব্যয় করা আমার আফসোসের কারণ হবে।দেখা যাবে দেশ-বিদেশের খবর নিতে নিতে এমন হয়ে গেছে যে নিজের মৃত্যুর পর আমার কি খবর হবে তার খবরও নিতে পারিনি।নিজের ইমান ও আমল তৈরী করতে পারিনি।অন্যের খোঁজ নিতে নিতে আর অন্যের সমালোচনা করতে করতেই আমার সময় কেটে গেছে।
আমার ভাই,নিজের জীবনের ব্যপারে সতর্ক হই।এই জীবনকে আল্লাহ তা’আলা বানিয়েছেন তাঁর ইবাদতের জন্য।তাঁর যিকিরের জন্য।তাঁর স্মরণের জন্য।কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো আমরা আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকি।আল্লাহর যিকির থেকে দূরে থাকি।ফলে যা হবার তাই হয়েছে।আমাদের জিন্দেগীতে বরকত কমে গেছে।পরিবারে অশান্তির হাওয়া বইছে।অভাব লেগেই আছে।ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে।অসুখ-বিসুখের কোন শেষ নেই।আমরা যখন আল্লাহর যিকির থেকে দূরে রয়েছি।আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল রয়েছি তখন আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ আমাদের থেকে দূরে রয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
فَاذْكُرُوْنِيْ أَذْكُرْكُمْ
“তোমরা আমাকে স্মরণ করো,আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো।”(সূরা বাকারা-১৫২ নং আয়াত)
আমার ভাই,এই আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে যিকির করতে বলেছেন।আল্লাহকে স্মরণ করার কথা বলেছেন।
আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকার কথা বলেছেন।আল্লাহর যিকিরের অর্থই হলো আল্লাহর হুকুম মত জীবন পরিচালনা করা।
আমরা যদি আল্লাহকে স্মরণ করি,আল্লাহর যিকির করি,আল্লাহর হুকুম মত চলি, আল্লাহও আমাদেরকে স্মরণ করবেন।আল্লাহ আমাদেরকে স্মরণ করার অর্থ হলো তিনি আমাদেরকে সাহায্য করবেন।আমাদের প্রয়োজন পূরণ করবেন।
আমার ভাই,আমরা আল্লাহর স্মরণ ছেড়ে দিয়েছি,আল্লাহর যিকির ছেড়ে দিয়েছি।সারাদিন কেটে যায় আল্লাহকে ডাকি না।মহব্বতের সঙ্গে,বিনয়ের সঙ্গে তাঁর যিকির করি না।তাঁর ইবাদত-বন্দেগী করি না, ফলে আল্লাহর সাহায্য আমাদের জন্য আসে না।আমাদের সমস্যা দূর হয় না।বরং সমস্যা লেগেই থাকে।
আমার ভাই,আমরা যদি আল্লাহর ইবাদতের জন্য অবসর হই,নিজেকে ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করি এবং আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত করি,আল্লাহ আমাদের জীবনের কাজগুলো গুছিয়ে দেবেন।আমাদের জীবনের অভাবও দূর করে দেবেন।
তিরমিযীর এক হাদীসে কুদসীতে এসেছে,আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
يَا ابْنَ آدَمَ
“হে আদম সন্তান
تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِيْ
আমার ইবাদতের জন্য অবসর হও,
أَمْلَأْ صَدْرَكَ غِنًى
আমি তোমার অন্তরকে ধনাঢ্যতায় ভরে দিবো
وَأَسُدَّ فَقْرَكَ
এবং তোমার অভাবও দূর করে দিবো।
وَإِنْ لاَ تَفْعَلْ
আর যদি না করো,
مَلَأْتُ يَدَيْكَ شُغْلاً
আমি তোমার উভয় হাতকে কর্ম ব্যস্ততায় ভরে দিবো
وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ
এবং তোমার অভাবও দূর করবো না।”(তিরমিযী-২৪৬২-সহীহ-কম্পিউটার ইসলামিয়া কুতুবখানা )
আমার ভাই,এই হলো বাস্তবতা।আমরা সারাদিন সব কাজই করি।খাওয়া-দাওয়া,ঘুম,ব্যবসা-বাণিজ্য,চাকরি-বাকরি সব কিছুই হয় কিন্তু হয় না একটাই তা হলো আল্লাহর ইবাদত।অথচ আমাদেরকে ইবাদতের জন্যই বানানো হয়েছে।আমরা যখন নিজেকে দুনিয়াবি কাজের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করতে পারিনি,আল্লাহর ইবাদতের জন্য অবসর হতে পারিনি,দুনিয়ার ধান্দায় সারাদিন কাটিয়ে দিচ্ছি তখন আমাদের যিন্দেগীটাও অশান্তিতে ভরে গেছে।পেরেশানির কোন শেষ নেই।এত আয় উপার্জনের পরও অভাব দূর হচ্ছে না।হবেই বা কি করে?আল্লাহ তো স্বয়ং বলেছেন আমার ইবাদতের জন্য নিজেকে ঝামেলা মুক্ত করো আমি তোমার অন্তর ধনী বানিয়ে দিবো।
তেমার অভাব দূর করে দিবো।আমরা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়েছি,কাজের কারণে নামায নষ্ট করি,কাজের কারণে তিলাওয়াত, যিকির থেকে দূরে থাকি।ফলে যে লাখ টাকা মাসে ইনকাম করে তারও অভাব ফুরায় না।তার অন্তরেও সুখ নাই।
আমার ভাই,আমরা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হই।গুরুত্বের সাথে আল্লাহর হুকুম গুলো পূরণ করতে থাকি।আল্লাহ তা’আলা আমাদের যিন্দেগীতে সুখ দেবেন।আমাদের জীবনের কাজগুলো গুছিয়ে দেবেন।
আমার ভাই,একদিন ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে।আমার সঙ্গে কিছুই যাবে না।আমার বাড়ি-ঘর,জমি-জমা,ধন-সম্পদ সব কিছুই পড়ে থাকবে।মৃত্যুর পর আমার বংশ মর্যাদাও কোন কাজে আসবে না।শুধু কাজে আসবে আমার আমল।আমি যদি আমল না করি দুনিয়ার বংশ মর্যাদা পরকালে কোন কাজে আসবে না।
মুসলিম শরীফের এক হাদীসে এসেছে,
হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ بَطَّأَ بِهٖ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهٖ نَسَبُهُ
যার আমল তাকে পিছিয়ে দেবে,তার বংশ তাকে এগিয়ে নিতে পারবে না।(মুসলিম-২৬৯৯)
আমার ভাই,দুনিয়াতে আমি চেয়ারম্যান হই,মেম্বার হই,ইন্জিনিয়ার হই,জমিদার হই,চৌধুরী হই আর শাহ হই আমার যদি আমল না থাকে,অন্যদের চেয়ে আমি আমল বেশি না করি তো কেয়ামতের দিন এ বংশ মর্যাদা আর পদবির দ্বারা আমি অন্যদের চেয়ে মর্যাদায় অগ্রসর হতে পারবো না।এজন্য দুনিয়াতে এসব বংশ মর্যাদা আর পদবির উপর গর্ব করে কোন লাভ নাই।
আমার ভাই,আল্লাহ যাকে চান তাকে জমিদার বানান,যাকে চান শাহ্ বানান,যাকে চান চৌধুরী বানান,যাকে চান চেয়ারম্যান বানান, যাকে চান মেম্বার বানান।কাউকে ১০০ বিঘা জমি দেন,কাউকে ৫০ বিঘা জমি দেন কাউকে ৫ বিঘা জমি দেন,কাউকে আবার কিছুই দেন না।আবার কাউকে কোটিপতি করেন,কাউকে ফকীর করেন।আবার আল্লাহ তা’আলা কাউকে ধলো বানান,কাউকে কালো বানান,কাউকে স্বাস্থ্যবান করেন,কাউকে রোগা করেন,কাউকে লম্বা করেন,কাউকে খাঁটো করেন।এতে মানুষের কোন হাত নেই।এজন্য আল্লাহ তা’আলা বান্দার চেহারা, ধন- সম্পদ,পদবি কোন কিছুই দেখেন না।তিনি দেখেন বান্দার অন্তর এবং আমল।
মুসলিমের এক হাদীসে এসেছে,
হুজুর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّ اللّٰهَ لاَ يَنْظُرُ إِلٰى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ
আল্লাহ তা’আলা তোমাদের চেহারা এবং ধন-সম্পদ দেখেন না
وَلٰكِنْ يَنْظُرُ إِلٰى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
কিন্তু তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর এবং আমলসমূহ।(মুসলিম-২৫৬৪)
আমার ভাই,এজন্য চেহারা,-সূরত ধন-সম্পদ নিয়ে গর্বের কোন কিছুই নেই।এগুলো আল্লাহর দান।আমার আমল যদি সুন্দর হয়,আমার অন্তর যদি বিশুদ্ধ হয়।আমার অন্তরে যদি আল্লাহর ভালোবাসা থাকে।আমি যদি আল্লাহর হুকুম মত জীবন পরিচালনা করি তাহলেই আমি সফলকাম হতে পারবো।অন্যথায় আমি ব্যর্থ হবো।
আমার ভাই,আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সৃষ্টি করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।কিছুকাল এ দুনিয়াতে থেকে আবার আমি আল্লাহর কাছে চলে যাবো।হাশরের মাঠে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।যারা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ এর আশা রাখে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে নেক আমল করতে বলেছেন।যারা নেক আমল করবে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে জান্নাত দেবেন।জান্নাতে আল্লাহ তা’আলা বান্দার সাথে সাক্ষাৎ করবেন।পক্ষান্তরে যারা দুনিয়াতে নেক আমল করবে না,গুনাহ করে করে জীবন কাটিয়ে দেবে আল্লাহ তা’আলা তাদের সাথে দেখা করবেন না।তাদের প্রতি তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হবেন।তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
فَمَنْ كَانَ يَرْجُوْ لِقَاءَ رَبِّهٖ
সুতরাং যে তাঁর রবের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে
فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا
সে যেন নেক আমল করে
وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهٖ أَحَدًا
এবং তার রবের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে।(সূরা কাহাফ-১১০)
আমার ভাই,আমরা যারা এই আশা রাখি যে মৃত্যুর পর আল্লাহর সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করবো।আল্লাহর দর্শন লাভ করবো আমাদের উপর আবশ্যক হলো আল্লাহর ইবাদত করা এবং এই ইবাদত হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য।মানুষ দেখানো ইবাদত করলে আল্লাহ কবুল করবেন না।তাই ইবাদত করার সময় সতর্ক থাকবো। আমার ইবাদত যেন কাউকে দেখানোর উদ্দেশ্যে না হয়।আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন।আমীন।
এরপর প্রথম বয়ানের শেষের লেখাগুলো বলে তাবলীগে বের হওয়ার তাশকিল করবো।
