দাওয়াত ও তাবলীগের গুরুত্ব
মুহতারাম দোস্ত ও বুজুর্গ,আলহামদুলিল্লাহ,আল্লাহ তা’আলার লাখো কোটি শোকরিয়া তিনি আমাদেরকে নামাযের পর কিছু কথা বলা এবং শোনার তাওফীক দান করেছেন।
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সর্বশেষ উম্মত করে পাঠিয়েছেন। আমাদের পর আর কোন উম্মত আসবেন না।আমরাই সর্বশেষ উম্মত।আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মহান আল্লাহ তা’আলা সর্বশেষ নবী করে পাঠিয়েছেন।তাঁর পরে আর কোন নবী নাই।তিনি সর্বশেষ নবী।আল্লাহ তা’আলা সূরা আহযাব এর ৪০ নং আয়াতে বলেন,
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِّجَالِكُمْ
মুহাম্মাদ তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নন।
وَلٰكِنْ رَّسُوْلَ اللّٰهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّيْنَ
কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী।
আবু দাউদ শরীফের ৪২৫২ নং হাদীসে এসেছে,নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ لاَ نَبِيَّ بَعْدِيْ
আমি সর্বশেষ নবী।আমার পরে কোন নবী নাই।
মেরে ভাই,আমাদের নবী নবুয়ত পাওয়ার পর সর্বপ্রথম মক্কার মধ্যে দাওয়াত দিয়েছেন।কিন্তু মক্কার লোকেরা তার দাওয়াত কবুল করেনি বরং বিভিন্নভাবে তারা নবীজীকে কষ্ট দিয়েছে।নামায পড়া অবস্থায় তাঁর শরীর মোবারকের উপর উঁটের নাড়িভুড়ি চাপিয়ে দিয়েছে।কখনো দাওয়াত দিতে গিয়ে তাঁর উপর ধূলোবালি নিক্ষেপ করেছে।কখনো থুতু নিক্ষেপ করেছে।কখন গালি দিয়েছে।কখনো মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। এত কিছুর পরও নবীজী দাওয়াত দিতেই থাকলেন।
যখন এই আয়াত নাযিল হলো,
وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِيْنَ
(হে মুহাম্মাদ) আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন।
নবীজী সাফা পর্বতে আরোহন করলেন।অতঃপর বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে ধরে ডাকতে লাগলেন।হে বনী ফিহর,হে বনী আদী,হে বনী আবদুল মুত্তালিব,হে বনী আবদে মানাফ।যখন তারা একত্রিত হলো নবীজী তাদেরকে বললেন,যদি আমি তোমাদেরকে খবর দেই যে এ পর্বতের পিছনে এক অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত আছে।তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? তারা বললো, অবশ্যই। কেননা আমরা আপনার থেকে কখনো মিথ্যা কথা শুনিনি।
মেরে ভাই,নবীজী আরবের মাঝে আল আমীন উপাধী অর্থাৎ সত্যবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।তিনি কখনো মিথ্যা বলেন নি।তাই তো লোকেরা তাঁর কাছে আমানত রাখতো।তাঁর কথা নির্দ্ধিধায় বিশ্বাস করতো।অতঃপর নবীজী বললেন,আমি তোমাদেরকে কঠোর আযাবের শাস্তির ভয় প্রদর্শন করছি।(বুখারী-৪৭৭০)
মেরে ভাই,মক্কার কাফেররা যখন দেখলো আমাদের নবীজী ইসলামের দাওয়াত দিয়েই যাচ্ছেন,কোনভাবেই তাঁকে বিরত রাখা যাচ্ছে না তখন তারা বিভিন্নভাবে নবীজী এবং সে সময় যে সকল সাহাবায়ে কেরাম মুসলমান হয়েছিলেন তাদেরকে কষ্ট দিতে লাগলো।শত শত নির্যাতন করার পরেও তারা নবীজীকে দাওয়াত দেয়া থেকে বিরত রাখতে পারলো না।এমনকি যে সকল সাহাবায়ে কেরাম মুসলমান হয়েছিলেন তাদের উপর পাশবিক নির্যাতন করার পরও তাদেরকে ইসলাম থেকে ফিরাতে পারলো না।
মেরে ভাই,এক পর্যায়ে কাফেররা যখন ইসলামের দাওয়াতকে বন্ধ করতে পারলো না আর দিন দিন মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তেই থাকলো
তখন তারা পরামর্শ করে নবীজীকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো।আল্লাহ তা’আলা নবীজীকে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন।নবীজী ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে মদীনা গেলেন।
মেরে ভাই,মদীনায় গিয়েও নবীজী শান্তিতে থাকতে পারলেন না।কাফেরদের সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধ করলেন।রক্ত ঝরালেন।দাঁত মোবারক শহীদ করলেন।ক্ষুধার কারণে পেটে পাথর বাঁধলেন।অনেক কষ্ট আর ত্যাগের পর এই দীন সারা আরবের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। মক্কা বিজয় হলো।নবীজী বিদায় হজের সময় সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে বললেন,
أَلَا هَلْ بَلَّغْتُ
আমি কি পৌঁছে দেইনি?
সাহাবায়ে কেরাম বললেন,হ্যাঁ আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।
অতঃপর নবীজী বললেন,
اللَّهُمَّ اشْهَدْ، فَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ
হে আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন।যারা উপস্থিত আছে তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের নিকট পৌঁছে দেয়।(বুখারী-১৭৪১)
মেরে ভাই,নবীজীর এই বাণী সাহাবায়ে কেরাম যথাযথ ভাবে পালন করেছেন।নবীজী দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম ইসলামের দাওয়াত নিয়ে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছেন।তাদের পর তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ীগণ ইসলামের দাওয়াত নিয়ে পৃথিবীর আনাচে কানাচে গেছেন।এভাবে পর্যায়ক্রমে এ দাওয়াতের জিম্মাদারি আমাদের উপর চলে এসেছে।এখন এ দাওয়াতের জিম্মাদারি যদি আমরা আদায় না করি কাল কিয়ামতের মাঠে নবীজীর সামনে আমরা কিভাবে মুখ দেখাবো।নবীজীর রেখে যাওয়া দীনের চেয়ে যদি নিজের ঘর-বাড়ি, ধনসম্পদ আর স্ত্রী-সন্তানই প্রিয় হয় তাহলে আমি কেমন মুসলমান হলাম।এজন্য ভাই এই দীন ইসলামকে সারা দুনিয়ায় প্রচারের জন্য আমাদেরকে নিয়ত করতে হবে।আল্লাহর রাস্তায় বের হতে হবে।
মেরে ভাই,এই উম্মতকে আল্লাহ তা’আলা শ্রেষ্ঠ উম্মত বলেছেন।তবে এই শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন দুইটা কাজের উপরে।আমরা যদি এই দুটি কাজ করি তাহলে আমরা শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করবো।আর যদি না করি তাহলে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে পারবো না।আল্লাহ তা’আলা সূরা আলে ইমরানের ১১০ নং আয়াতে বলেন,
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ
তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত তোমাদেরকে বের করা হয়েছে মানুষের (কল্যাণের) জন্য।
تَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ
তোমরা সৎকাজের আদেশ করে থাক এবং অন্যায় কাজে বাধা দিয়ে থাক।
মেরে ভাই,আল্লাহ তা’আলার চাওয়া হলো আমাদের মধ্যে এমন একটা জামাত থাকবে যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকবে,সৎকাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করবে।আর এ জামাতকে বলা হয়েছে সফলকাম জামাত।আল্লাহ তা’আলা সূরা আলে ইমরানের ১০৪ নং আয়াতে বলেন,
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُوْنَ إِلَى الْخَيْرِ
তোমাদের মধ্যে এমন একটা জামাত থাকা চাই যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে,
وَيَأْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ ۚ
সৎকাজে আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজে বাধা দেবে।
وَأُولٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ
তারাই হলো সফলকাম।
মেরে ভাই,আমরাই শেষ উম্মত।আমাদের নবী হলেন সর্বশেষ নবী।কিয়ামত পর্যন্ত নতুন কোন নবী আসবেন না।নতুন কোন উম্মতও আসবেন না।এজন্য আমাদেরকেই দাওয়াতের মেহনত করতে হবে।আমাদের শুধু নিজে আমল করলেই চলবে না।বরং নিজেকেও জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে।নিজের পরিবার-পরিজনকেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে।
আল্লাহ তা’আলা এই উম্মতের ইমানদার ব্যক্তিদেরকে সম্বোধন করে সূরা তাহরীমের ৬ নং আয়াতে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا
হে ইমানদারগণ
قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَارًا
তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজের পরিবার-পরিজনদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।
মেরে ভাই,শুধু একাই যদি আমল করি।অন্যকে দাওয়াত না দেই ফলে এলাকার লোকজন গুনাহের মধ্য জড়িয়ে যায়,নাফরমানী শেষ সীমায় পৌঁছে যায় তখন কিন্তু আল্লাহ তা’আলা শাস্তি পাঠাবেন।আর আল্লাহর গযব যদি এসে যায় তখন আমরা কেউ কিন্তু বাঁচতে পারবো না।
তিরমিযী শরীফের এক হাদীসে এসেছে,
নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهٖ
ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ,
لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ
অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অন্যায় কাজ থেকে বাধা প্রদান করবে
أَوْ لَيُوْشِكَنَّ اللّٰهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ،
অন্যথায় অতিশীঘ্রই আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর আযাব পাঠাবেন
ثُمَّ تَدْعُوْنَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ.
অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে দু’আ করবে কিন্তু তোমাদের দুআ কবুল করা হবে না।(তিরমিযী-২১৬৬-হাসানা-কম্পিউটার নুসখা-ইসলামিয়া)
মেরে ভাই,এজন্য এই দাওয়াতের কাজ আমাদেরকে শিখতে হবে।দাওয়াত নিয়ে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়তে হবে।নিজেরাও দীনের উপর চলার উপর চেষ্টা করবো।অন্যকেও দীনের উপর উঠানোর ফিকির করবো।কোন কোন ভাই যেতে ইচ্ছুক। ভাই খুশি খুশি নাম লেখায়।
