১.
রাত সোয়া চারটা।মাদরাসার বেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেলো।এখন সবাইকে ঘুম থেকে উঠতে হবে।চলছে শীত মৌসুম।বাইরে কনকনে ঠান্ডা।কম্বল ছেড়ে মন চাই না উঠতে।তবুও উঠতেই হবে।এখন যে তাহাজ্জুদের সময়।এই সময় দোয়া কবুল হয়।আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে এসে বান্দাদেরকে ডাকতে থাকেন।
আল্লাহ্ ডাকবেন আর আমি ঘুমিয়ে থাকবো, এটা কেমন করে হয়।আমাদের রুমের বাতি জ্বলে উঠলো।বিছানা পত্র গুছিয়ে এই কনকনে শীতে বাইরে বের হলাম।মাদরাসার চারদিক থেকে দলে দলে ছাত্ররা প্রয়োজন সেরে অজুখানার দিকে ছুটছে আমিও তাদের অনুসরণ করলাম।
অযুখানায় গিয়ে দেখি, হেফজখানার ছোট্ট ছোট্ট ছেলেরা ওযু করছে।ট্যাপ চালু করে পানি স্পর্শ করতেই পুরো শরীর কেঁপে উঠলো।কি ঠাণ্ডা রে বাবা!হাত পা বরফ হয়ে যাচ্ছে।বাপরে বাপ, এই কনকনে ঠান্ডায় ছোট ছোট ছেলেরা এই কিনকিন ঠাণ্ডা পানি দিয়ে অজু করছে!
এই যে,এত কষ্ট কেন করছে তারা? তাদের এত সব কষ্ট স্বীকার করার কারণ হলো,তারা এখন আল্লাহ তায়ালার কালাম, কুরআন পড়বে।যেন আল্লাহ তায়ালা খুশি হন।তিনি যেন আজাব গজব দিয়ে ধ্বংস করে না দেন।
কুরআন আল্লাহ তায়ালার কালাম।যে কুরআন পড়ে,আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি অনেক খুশি হন।তার উপর অনুগ্রহ করেন তার গুনাহগুলো মাফ করে দেন।তাকে নিজের আপন করে নেন।
আমাদের এই দেশে যেই পরিমান অশ্লীল এবং কুকর্ম বিস্তার লাভ করেছে, যেই পরিমান অন্যায় এবং গুনাহের কাজ হচ্ছে, হাফেজে কুরআন গণ যদি রাতের আরামের ঘুম হারাম করে কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে আল্লাহ তাআলার কালাম কুরআন না পড়তেন,তো কত আগেই এইদেশ আজাব গজব এ ধ্বংস হয়ে যেতো।
এজন্য প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায়, প্রতিটি মহল্লায় মহল্লায় একটি করে হেফজখানা এবং মক্তব-নূরানী খানা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরী।যত বেশি হিফজখানা এবং মক্তব-নূরানীখানা প্রতিষ্ঠা হবে, ততো বেশি এদেশ খোদায়ী গজব থেকে হেফাজত থাকবে।এদেশের উপর রহমত বর্ষিত হবে।
আমরা প্রত্যেকেই কুরআন শিখবো। কুরআন শেখা থেকে কেউ যেন মাহরুম না হয়।আমাদের সন্তানদেরকে কুরআন শিক্ষা দিবো।কুরআনের হাফেজ বানাবো। আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করবো,তিনি যেন আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে কুরআনের হাফেজ হিসেবে কবুল করে নেন। কারণ,যে কুরআন শেখেনি,নিজের সন্তানদেরকে কুরআন শেখায় নি, তার মত হতভাগা আর কেউ নেই। এজন্য আমরা যেন হতভাগা না হয়।
৩.
কিনকিনে বরফের মতো ঠাণ্ডা পানি দিয়ে আমিও অযু করলাম।অযু শেষে মসজিদে প্রবেশ করলাম।আহা!আমি কত ভাগ্যবান। আমি আল্লাহ তাআলার মেহমান হয়ে গেলাম।কারণ, হাদিসে আছে, মসজিদ আল্লাহ তাআলার।যে এ ঘরে আসে,সে আল্লাহ তায়ালার মেহমান হয়ে যায়।আহ!কষ্ট লাগে ওই ভাইদের দেখে, যারা মসজিদ ছেড়ে দিয়েছে।তারা কতই না ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে! আল্লাহ তাআলা ভাইদের হেদায়েত দান করুন। জামাতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার তাওফিক দান করুন।আমীন।
মসজিদের বিভিন্ন অংশে ছাত্ররা নামাযে দাঁড়িয়ে আছে।মসজিদের পরিবেশ নীরব, শান্ত।কোনো পাশ থেকে কোরআন তেলাওয়াতের গুনগুন আওয়াজ আসছে।কোন পাশ থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে।দোয়ায়,আল্লাহ তাআলার নিকট ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে কেউ কেউ।প্রত্যেকে আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের মনের কথা তুলে ধরছে।রব্বে কারীমের সাথে তাদের ভাবের আদান-প্রদান হচ্ছে।রবের সাথে প্রেমের মজা যদি কেউ পেয়ে যায় তার আর রাতে ঘুম আসে না।ঘুমালেও তার চিন্তা থাকে,কখন শেষ রাত হবে,কখন রবের সাথে নিভৃতে আলাপ করতে পারবো।
কিয়ামতের মাঠে একজন ফেরেশতা আহ্বান করবে,কোথায় ঐ সকল লোক যাদের পিঠ রাতে বিছানা থেকে পৃথক থাকতো।তখন একদল লোক উঠবে। তারা হবে খুব অল্প।তারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
প্রিয় পাঠক,শেষ রাতে কখনো উঠেছো?কখনো রবের কাছে কান্নাজড়িত কন্ঠে দোয়া করেছো?কখনো জাহান্নামের ভয়ে অশ্রু প্রবাহিত করেছো?তুমি যদি দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালার সাথে মহব্বতের সম্পর্ক কায়েম করতে পারো,মৃত্যুর পর তোমার কোন ভয় থাকবেনা।তুমি চিন্তিতও হবেনা।তোমার জন্য থাকবে স্থায়ী মহা পুরস্কার।
আর যদি তুমি দুনিয়াতে রবের সাথে মহব্বতের সম্পর্ক কায়েম করতে না পারো,রবকে ভুলে থাকো,মৃত্যুর পর মহান রব তোমাকে ভুলে যাবেন।তোমার ঠিকানা হবে জাহান্নামের উত্তপ্ত আগুনের মধ্যে।তাই নিজের জীবন যদিও চলে যায়,আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি করোনা।তাঁকে অসন্তুষ্ট করোনা।
আমিও তাদের সাথে আল্লাহ তায়ালার তাওফিকে নামায পড়লাম।আল্লাহ তায়ালার কাছে মুনাজাত করলাম। নামায শেষে নিজ নিজ ছাত্রাবাসে এলাম।সকলে মহান রব্বে কারীমের কালাম, কোরআন তেলাওয়াতে মশগুল হলো। আমিও তেলাওয়াত শুরু করলাম।
তুমি কি নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করো?না,কোরআন তাকে রেখে দিয়ে ধূলাবালিতে ময়লাযুক্ত করেছো?যদি এমন হয় যে,তুমি দীর্ঘদিন থেকে কোরআন পড়ো নি,তাহলে আজই শুরু করে দাও।বেশি করে কোরআন পড়ো।না জানলে শেখো।কোরআনকে চুমু খাও। বুকে জড়াও।এ কোরআন কেয়ামতের দিন তোমার জন্য সুপারিশ করবে।আর যদি কোরআন না পড়ো,অবহেলা,অলসতা করে পিছনে ফেলে রাখো,কোরআন তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে।তোমার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।পড়বে তো নিয়মিতো?
৩.
ফজরের নামাযের সময় হলো।আমরা মসজিদে গেলাম।সুন্নাত আদায় করলাম। কিছুক্ষণ পর একামত শুরু হলো।নামাযে দাঁড়ালাম।ইমাম সাহেবের সুমধুর কন্ঠে কোরআনের তেলাওয়াত শুনলাম।মন প্রশান্তিতে ভরে গেলো।
নামায শেষ হলো। নামাজের পর মসজিদে বসেই সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াত শুরু করলাম।পুরো মসজিদ কুরআনের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো।সুরা ইয়াসীন শেষ হলো।ইমাম সাহেবের সাথে আমরা মুনাজাত করলাম। মুনাজাত শেষে নিজ নিজ কামরার দিকে রওনা হলাম।
কামরায় গিয়ে কিতাব নিয়ে আমরা দরসগাহে গেলাম।ফজরের নামাযের পর আমাদের ক্লাস শুরু হয়।ফজরের পর দুটি ক্লাশ হয়।আমরা দরসগাহে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর হুজুর এলেন।ঘন্টা শুরু হলো।একে একে দুটি ক্লাশ শেষ হলো।
ক্লাশ শেষ করে আমরা কামরায় গেলাম। কিছু ছাত্র খাবার নিতে বোর্ডিংয়ে গেলো। কামরায় কেউ পড়তে বসলো।কেউ কিছুক্ষণ ঘুমালো।অতঃপর সকালের নাশতা করলাম।নাশতার পর কিছুক্ষণ পড়াশুনা করলাম।
সোয়া নয়টায় বেল বাজলো।সাড়ে নয়টায় ক্লাস শুরু হবে।ক্লাসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।জরুরত সেরে অযু করে আমরা ক্লাসে বসলাম।সাড়ে নয় টায় ক্লাস শুরু হলো।একে একে চারটি ক্লাশ করলাম।ক্লাশ শেষ হলো সাড়ে বারোটায়।ক্লাস শেষ করে আমরা গোসল করলাম।অতঃপর দুপুরের খানা খেলাম।যোহরের নামায পড়লাম।
যোহরের নামাযের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলাম।এরপর আবার ক্লাস শুরু হলো। ক্লাস শেষ হলো আসরের আজানের পাঁচ মিনিট আগে। বিকেলের ক্লাস শেষ করে মসজিদে গেলাম।আসরের নামায আদায় করলাম।নামাজ শেষ করে কেউ প্রয়োজনে বাজারে গেলো।কেউ শারীরিক ব্যায়ামের উদ্দেশ্যে হাঁটতে গেলো।কেউ বা কামরায় কিতাব পড়তে বসলো।
মাগরিবের আজান হলো।প্রত্যেকে আপন কাজ সেরে মসজিদে চলে এলাম। মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। নামায শেষ করে কামরায় এলাম।
এখন তাকরার শুরু হবে।ক্লাসে যা পড়ানো হয়েছে একজন করে সেগুলো আলোচনা করবে।একেকজন একেক কিতাব তাকরার করায়।এভাবে ইশা পর্যন্ত পড়া আলোচনা করলাম।ইশার আযান হলো।আমরা খানা খেতে বসলাম। খাবার শেষ করে নামাযের উদ্দেশ্যে মসজিদে গেলাম।
ইশার নামায আদায় করলাম।নামাযের পর তাবলীগের তালিম হলো। তালিম শেষে কামরায় এলাম।কিতাব মুতালাআ শুরু করলাম।সাড়ে নয়টায় ঘুমানোর বেল দিলো।কেউ ঘুমাতে গেলো।কেউ মসজিদে পড়তে গেলো।আমরা রাত ১১ টা পর্যন্ত পড়লাম।অতঃপর ঘুমাতে গেলাম।এভাবে কাটে মাদরাসার ছাত্রদের জীবন।
জীবনের সব আরাম আয়েশ ত্যাগ করে আল্লাহ তা'আলার দ্বীন শিক্ষা করার জন্য চেষ্টা মুজাহাদা করে যাচ্ছে।আবার এই দীন মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য বাড়ি ঘর ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে।একজন মাদরাসা ছাত্রের প্রকৃত আরাম হলো মৃত্যুর পর।কবরে সে আরামে ঘুমাবে।আর কবর থেকে উঠে জান্নাতের বাসিন্দা হবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে কবুল করুন আমীন।